হিন্দি সিনেমার নয়া মাইলস্টোন গড়লেন দীপিকা পাডুকোন-মেঘনা গুলজার

CHHAPAAK MOVIE REVIEW: অ্যাসিড হামলার মতো ঘৃণ্য অপরাধ আর ফলস্বরূপ নিম্ন মধ্যবিত্ত মহিলার চামড়া থেকে শুরু করে সামাজিক পরিচয় পুড়িয়ে দেওয়ার মতো পুরুষতান্ত্রিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি জোগানোর নাম ছপাক। নির্দ্বিধায় হিন্দি চলচ্চিত্রের নয়া মাইলফলক ছপাক।



পরিচালক: মেঘনা গুলজার
অভিনয়ে: দীপিকা পাড়ুকোন, বিক্রান্ত মাসে
রেটিং: ৩ স্টার (৫ এর মধ্যে)
ভালো মন্দের ঊর্ধ্বে গিয়ে ‘Chhapaak' আসলে একটি জরুরি সিনেমা। সমাজ নির্মিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞা আর পিতৃতন্ত্রের প্রগাঢ় আস্ফালনের বিরুদ্ধে গিয়ে ছপাক আসলে এই সময়ের উপযুক্ত সিনেমা। অ্যাসিড হামলার মতো ঘৃণ্য অপরাধ আর ফলস্বরূপ নিম্ন মধ্যবিত্ত মহিলার চামড়া থেকে শুরু করে সামাজিক পরিচয় পুড়িয়ে দেওয়ার মতো পুরুষতান্ত্রিক অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তি জোগানোর নাম ছপাক। নির্দ্বিধায় হিন্দি চলচ্চিত্রের নয়া মাইলফলক ছপাক। পরিচালক মেঘনা গুলজার (Director Meghna Gulzar) এবং অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন (Deepika Padukone) একটি ভয়াবহ সত্য কাহিনিকে বড় পর্দায় যেভাবে ফুটিয়েছেন তা তর্কাতীত ভাবেই সৎ।

আতিকা চৌহান এবং মেঘনা গুলজারের লেখা ‘ছপাক' পিতৃতন্ত্রের কুৎসিত চেহারা, সমাজের অসংবেদনশীলতা এবং মালতী আগরওয়ালের গল্পের মাধ্যমে আইনি ব্যবস্থার গলদকেই তুলে ধরেছে। বাস্তব জীবনের লক্ষ্মী আগরওয়ালের চরিত্রে অভিনয় করেছেন দীপিকা পাডুকোন। ২০০৫ সালে দিল্লির একটি বাজারে একজন পুরুষের অ্যাসিড হামলায় আক্রান্ত হওয়া, পরবর্তী ‘ইন্ডিয়ান আইডল' হয়ে ওঠার স্বপ্ন ভেঙে যাওয়া এবং আস্তে আস্তে নিজেকে ফিরে পেয়ে লড়াই করার গল্প ছপাক।

তবে ছপাকের শুরুটা এখানেই না। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে নির্ভয়া গণধর্ষণ কাণ্ডে দেশ জোড়া বিক্ষোভের মধ্যে দিয়েই সিনেমাটি শুরু। এখানেই একটি ঘটনাস্থলে এক টেলিভিশন সাংবাদিক এবং সাংবাদিক-সমাজকর্মী আমোল (বিক্রান্ত মাসে) মধ্যেকার কথোপকথনে প্রথম মালতীর নাম শোনা যায়। তাদের আলোচনার বিষয়ই ছিল অ্যাসিড বিক্রির বিরুদ্ধে একটি জনস্বার্থ মামলা। এই মামলাই দায়ের করেছিলেন অ্যাসিড আক্রান্ত মালতী আগরওয়াল।
পর্দায় যখন মালতীর প্রথম সাক্ষাৎ মেলে তখন তার আইনি লড়াইয়ের সাত বছর অতিক্রান্ত । জীবনটাই তার জন্য আস্ত একটা সংগ্রাম। চাকরি পাওয়া কঠিন, মান্যতা পাওয়া কঠিন। আর এই সব সমস্যায়, সব অভিব্যক্তিতে দীপিকার অভিনয় হৃদয় নিঙড়ানো বললেও কমই বলা হয়।
elimn5h
Chhapaak Movie Review: সিনেমার একটি দৃশ্যে দীপিকা পাডুকোন
ছপাক এমন এক নারীর কাহিনি যিনি আসলে উদাহরণও, লড়াইয়ের, হার না মানা চেতনার উদাহরণ। কেবল একা নিজের লড়াই না, বহু অ্যাসিড আক্রান্তের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের মুখ। মেঘনা গুলজারের পরিচালনা আর দীপিকার অভিব্যক্তি, খুব গভীরে নাড়া দেবেই, দিতে বাধ্য।
পরে ছায়া ফাউন্ডেশন নামের একটি এনজিওতে কাজ শুরু করতে গিয়ে আমোল ও মালতীর আলাপ। আমোল আর মালতীর মধ্যেকার সম্পর্ক, বন্ধুতা নীরব প্রেমই বলা যায়। দু'টি চরিত্রের মধ্যে মুগ্ধতা আর প্রেমকেও একটুও স্থূল না করে, সহজ ভাবেই সামলেছেন পরিচালক।
fjiai7ig
Chhapaak Movie Review: সিনেমার একটি দৃশ্যে দীপিকা পাডুকোন
ছপাকে দু'টি ফ্ল্যাশব্যাক রয়েছে, একটি প্রথমার্ধে, অন্যটি দ্বিতীয়ভাগে। প্রথম ফ্ল্যাশব্যাকে, মালতীকে দিল্লির একটি রাস্তায় অ্যাসিড দিয়ে আক্রমণের দৃশ্য এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা দেখানো হয়। দ্বিতীয় ফ্ল্যাশব্যাকে হামলার আরও আগে তার থেকে বয়সে বড় বশির খান (বিশাল দহিয়া) এবং স্কুলের সহপাঠী রাজেশের (অঙ্কিত বিস্ত) সঙ্গে মালতীর আলাপচারিতার দৃশ্য সামনে আসে।
ছপাকে বারে বারেই স্পষ্ট আইন কীভাবে অ্যাসিড হামলার ঘটনায় বিচার করে। মালতী এবং তার পরিবারের আবেগ ও যন্ত্রণার পাশাপাশি সিনেমাতে দু'টি সমান্তরাল আইনি লড়াইয়ের গল্পও বলা হয়েছে। এক- অপরাধীর বিরুদ্ধে মামলা করার, অন্যটি মালতীর অ্যাসিড বিক্রির নিষেধাজ্ঞার জন্য জনস্বার্থ মামলা।
ihb62sv
Chhapaak Movie Review: সিনেমার একটি দৃশ্যে দীপিকা পাডুকোন
মালতীর আইনজীবি অর্চনা বাজাজের ভূমিকায় মাধুরজিৎ সারঘি চুটিয়ে অভিনয় করেছেন। পায়েল নায়ার শিরাজ জামশেদজির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যার বাড়িতে মালতীর বাবা (মনোহর তেলি) রান্নার কাজ করেন। চিত্রনাট্যটিতে মালতীর বাবা-মায়ের বিশেষ ভূমিকা না থাকলেও মায়ের ভূমিকায় গীতা আগরওয়ালের অভিনয় বেশ লক্ষ্যণীয়।
বিক্রান্ত মাসের অবশ্য বিশেষ কিছুই করার ছিল না। অভিনেতা অবশ্য নিজের স্বল্প জায়গাতেও অভিনয় দিয়ে এক উচ্চতা তৈরি করেছেন।
১২৩ মিনিটের সিনেমা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে নানা দৃশ্য যা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে ছপাক নিজস্ব গতিতে মালতীর গল্প বলেছে, কেবল মালতী নয়, গ্রাম, নগর, পাহাড়, জঙ্গল, কর্পোরেট সমস্ত যাপনে মিশে লক্ষ্মী, মালতী, মণীষাদের গল্প। যে দৃশ্যে আইনজীবী মালতীকে (বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ চাপা দিয়ে শুয়ে থাকা দীপিকা) লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য পরামর্শ দিচ্ছেন, ক্যামেরাতে চার নারীর মুখ, সিরাজ, মালতী, মালতীর মা এবং অর্চনা ভেসে ওঠে, যা তাদের সংগ্রামের প্রকৃতি এবং সংহতির প্রয়োজনীয়তাকেই ফুটিয়ে তোলে।
ob52q40o
Chhapaak Movie Review: সিনেমার একটি দৃশ্যে দীপিকা পাডুকোন
সিনেমাটোগ্রাফার মলয় প্রকাশের একজন স্বাধীন ডিওপি হিসাবে এটিই দ্বিতীয় কাজ। রাস্তা, বাড়ি, হাসপাতাল, আদালত- মালতীর ছড়িয়ে থাকা জায়গাগুলো তার ক্যামেরায় যেন পৃথক চরিত্র হয়ে উঠেছে, প্রতিটি জায়গার সঙ্গে মালতীর তীব্র লড়াই, অদম্য জেদ আর তার সংগ্রামের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই যেন প্রতিফলিত। সিনেমার সম্পাদনার দায়িত্বে নীতিন বৈদও (মাসান, রাজি, গলি বয়) তার দক্ষতা এবং সংবেদনশীলতাকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন  যা চলচ্চিত্রটিকে নিজস্ব গতি দিয়েছে।
ছপাকের বেশ কয়েকটি অংশ সূক্ষ্মভাবে নির্মিত। কেবল দীপিকা পাডুকোনের জন্য নয়, সমাজের শিকড়ে দানা বেঁধে থাকা চরম পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাহস পাওয়ার জন্যই এই সিনেমাটি দেখে ফেলাই যায়।