২০ রক্ষিতা নিয়ে কোয়ারেন্টাইনে যাওয়া সেই রাজার আরো কিছু কাণ্ড

থাইল্যান্ডের রাজার নিভৃতবাস তার জীবনযাত্রার থেকেও রাজকীয়। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে গত মাসেই স্বেচ্ছায় কোয়রান্টিনে গিয়েছেন ৬৭ বছর বয়সি রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণ। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবেই তার এই সিদ্ধান্ত।
নিভৃতবাসে রাজার সঙ্গী হয়েছেন তার ২০ জন রক্ষিতা। তাদের নিয়ে রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণের বর্তমান ঠিকানা এখন জার্মানির বাভারিয়ান আল্পসের বিখ্যাত হোটেল ‘গ্র্যান্ড হোটেল সোনেনবিখল’।
এই হোটেলের একটি বড় অংশে বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে রাজার ইচ্ছানুসারে। আপাতত হোটেলে সাধারণ পর্যটকের প্রবেশ নিষিদ্ধ। কিন্তু রাজার জন্য সেই নিয়ম শিথিল করে খুলে দেওয়া হয়েছে হোটেলের দরজা।
করোনা পরিস্থিতির জেরে গত ২৬ মার্চ থেকে থাইল্যান্ড জুড়ে জারি হয়েছে জরুরি অবস্থা। তার মধ্যে দেশবাসীকে রেখে রাজা চলে গিয়েছেন নিশ্চিত আশ্রয়ে। এই প্রসঙ্গে থাইল্যান্ডের অ্যান্টি ডিফেমেশন আইনের জোরে সেই দেশের সংবাদমাধ্যমের আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছেন রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণ।
কিন্তু বন্ধ করা যায়নি সোশ্যাল মিডিয়ার মুখ। সেখানে তীব্র সমালোচিত হয়েছেন রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণ। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তার এই সিদ্ধান্তকে ‘পলাতক’ মনোভাব বলেই তকমা দিয়েছে। সেখানেই তিনি যথেষ্ট আক্রমণের লক্ষ্য।
টুইটারে সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছে, প্রজাদের সঙ্কটকালেই রাজা যদি তাদের পাশে না থাকেন, তা হলে রাজার প্রয়োজন কী!
প্রচলিত প্রাচীন রীতি অনুযায়ী রাজা মহা ভাজিরালংকর্ণ পরিচিত ‘রাজা দশম রাম’ নামেও। তার জন্ম ১৯৫২ সালের ২৮ জুলাই। বাবা রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন তিনি। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ মতে তার রাজ্যাভিষেক হয়। রীতি অনুযায়ী ব্যাংককে হয় তার রাজ্যভ্রমণ।
ভাজিরালংকর্ণের পড়াশোনা প্রথম থেকে শেষ অবধি পুরোটাই ইংল্যান্ডে। এর পর তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনি ও ক্যানবেরার নামী প্রতিষ্ঠান থেকে সেনা প্রশিক্ষণ নেন। দেশে ফিরে তিনি প্রথামাফিক সেনাবাহিনীতে কর্তব্যরতও ছিলেন।
থাইল্যান্ডের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী তিনি রাজ্যাভিষেকের আগে সন্ন্যাসজীবনও পালন করেন। ১৯৭৮ সালে তিনি দু’সপ্তাহের জন্য এক বিহারে বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে ছিলেন।
১৯৭৭ সালে বাজিরালংকর্ণ বিয়ে করেন তার আত্মীয়া সোওয়ামসায়ালি কিতিয়াকারাকে। সে বছরেই জন্ম হয় তাদের একমাত্র মেয়ে, বজ্রকিতিয়াভার।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি যুবরাজ বাজিরালংকর্ণ লিভ ইন শুরু করেন অভিনেত্রী যুবধিদা পলপ্রাসার্থের সঙ্গে। জন্ম হয় তাদের পাঁচ সন্তানের। চার ছেলে এবং এক মেয়ের।
কিন্তু দীর্ঘদিন তাকে ডিভোর্স দেননি স্ত্রী কিতিয়াকারা। তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয় ১৯৯৩ সালে। ব্যর্থ বিয়ের দায় পুরোটাই স্ত্রীর উপর চাপিয়ে দেন সেকালের যুবরাজ, আজকের রাজা।
১৯৯৪ সালে যুবধিদা পলপ্রাসার্থকে বিয়ে করেন বাজিরালংকর্ণ। বিয়ের পরে যুবরানির নতুন নাম হয় সুজারিনী ভিভাচারাওয়ংসে। কিন্তু বিয়ের দু’বছর পরে সন্তানদের নিয়ে সুজারিনী নিজের নতুন ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জেরে পালিয়ে যান আমেরিকায়। পরে ভাজিরালংকর্ণ তার কন্যাকে থাইল্যান্ডে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু চার ছেলে থেকে যান তাদের মায়ের সঙ্গেই।
তাদের সব কূটনীতিক সুবিধে এবং রাজপরিচয় কেড়ে নেওয়া হয়। যে মেয়েকে নিজের কাছে আনতে পেরেছিলেন, তাকে থাইল্যান্ডের রাজকন্যার পরিচয় দেওয়া হয়।
২০০১ সালে তৃতীয় বিয়ে করেন বাজিরালংকর্ণ। এ বার তার স্ত্রী শ্রীরশ্মি সুওয়াদি ছিলেন সাধারণ তাই-নাগরিক। কোনও রাজপরিচয় তার ছিল না। চার বছর পরে পুত্রসন্তানের জন্মের পরে তাদের বিয়ে প্রকাশ্যে আনা হয়।
বিয়ের ১৩ বছর পরে ভেঙে যায় ভাজিরালংকর্ণের তৃতীয় দাম্পত্য। বাজিরালংকর্ণের অভিযোগ ছিল, সুওয়াদির পরিবারের সদস্যরা দুর্নীতিতে জড়িত। ফলে তাদের কাছ থেকেও কেড়ে নেওয়া হয় প্রাপ্য রাজোচিত সুযোগসুবিধেও।
২০১৯-এ তার অভিষেকের তিন দিন আগে চতুর্থ বিয়ে করেন ভাজিরালংকর্ণ। সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি পাণিগ্রহণ করেন ব্যক্তিগত রক্ষী দলের উপপ্রধান সুথিদাকে। বিয়ের পরই সুথিদাকে ‘রাণী’ উপাধি দেন রাজা।
সুথিদা তিদজাই আগে ফ্লাইট অ্যাটেন্ড্যান্ট ছিলেন। ২০১৪ সালে রাজা মহা বাজিরালংকর্ণ তাকে ব্যক্তিগত রক্ষী দলের ডেপুটি কমান্ডার নিযুক্ত করেন। কিছু বিদেশি সংবাদমাধ্যম বিয়ের আগেই সুথিদা ও রাজার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের খবর ফাঁস করে। তবে রাজপ্রাসাদের তরফে বিষয়টি স্বীকার করা হয়নি।
২০১৯-এই তার এক রক্ষিতার কাছ থেকে বিশেষ পরিচয় ও সুযোগ সুবিধে প্রত্যাহার করেন ভাজিরালংকর্ণ। তার অভিযোগ ছিল, ওই রক্ষিতা নিজেকে পদমর্যাদায় রাণীর সমকক্ষ ভাবছিলেন। তার বিরুদ্ধে রাজা ও রাজপরিবারের বাকি সদস্যের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও ছিল। আনন্দবাজার।