কৃষক বাঁচলে বাঁচবে দেশ

শ্রমিক সংকটে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের পরও ফসল ঘরে তুলতে পারা নিয়ে শঙ্কায় যশোর, সিলেট, বাগেরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃষক। বোরো ধান কাটা হলে আউশ আমন পাট বীজ বোনার সিজন শুরু হবে। কিন্তু কে বুনবে? শ্রমিক নেই, একই সাথে সমস্যা বীজে। পাটের বীজ আমদানি হয়। এখন আমদানি বন্ধ। ফলে অর্ধেক জমি খালি পড়ে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সংকট সবজি চাষে। সেখানেই দেখা দিতে পারে বীজ সংকট।
বৃষ্টি কম হওয়ায় অধিক সেচের প্রয়োজন পড়ছে, সেচ যন্ত্রের অভাব আছে। অনেক ক্ষেতে যন্ত্র নষ্ট। নতুন যন্ত্র আনা কিংবা পুরনো যন্ত্র ঠিকঠাক করার ব্যবস্থা নেই। লকডাউন চলছে। বাইরে বেরুলেই করা হচ্ছে হয়রানি। কৃষক পড়েছে উভয় সংকটে। পটুয়াখালীতে ক্ষেত ভর্তি তরমুজ কিন্তু যান চলাচল আর শ্রমিক সংকটের কারনে বিক্রি হচ্ছে না তরমুজ, আগাম জাতের তরমুজ পচতে শুরু করেছে। কৃষকের মাথায় হাত।
কাপ্তাই হ্রদে শুকিয়ে যাওয়া চরে প্রতিবছর স্থানীয়রা নানা জাতের সবজি, ধান চাষ করে। বরাবরের মতো এবারও ফলন ভালো, কিন্তু হাটবাজার বন্ধ থাকায় বিক্রি হচ্ছে না কিছুই। লাভের পরিবর্তে ব্যাপক ক্ষতির মুখে সেখানকার কৃষক . রাঙ্গামাটিতে আনারসের বাম্পার ফলন। এ বছর প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়েছিল, গতবারের চেয়ে ফলন হয়েছিল অনেক বেশী। কিন্তু সেখানে ক্রেতা নেই, পরিবহন নেই। ক্ষেতেই আনারস পচে যাচ্ছে। প্রতি আনারস তিন টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে না। ভিটামিন সি শরীরের জন্য দরকার। আনারস ভিটামিন সি’তে ভরপুর। সেই মূল্যবান আনারস ঢাকায় প্রায় অদৃশ্য, ত্রিশ চল্লিশ টাকাতেও ছোট্ট একটা আনারস মিলছে না। আর রাঙ্গামাটিতে ক্ষেতে আনারস নষ্ট হচ্ছে, কৃষক দিশেহারা।
শহরে ব্যাপক চাহিদা থাকার পরও চট্টগ্রামে প্রতিদিন এক লাখ লিটার দুধ নষ্ট হচ্ছে। গ্রামে বিশ টাকায় লিটার শহরে ৭৫ টাকাতেও দুধ নেই। চারপাশে অবিশ্বাস্য সমন্বয়হীনতা, অব্যবস্থাপনা। একদিকে মাঠ ভর্তি সোনা ফসল নিয়ে কৃষকের মাথায় হাত অন্যদিকে ক্ষুধার জ্বালায় ত্রাণের ট্র্যাকে ক্ষুধার্ত মানুষের হামলা। .করোনা প্রতিরোধে সরকার আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছে, প্রতিশ্রুত আর্থিক সাহায্য সরাসরি কৃষকের হাত দিয়ে তাদের ক্ষেতের ফসল সেনাবাহিনী পুলিশ আনসার বিজিবি’র মাধ্যমে তাদের শত শত বসে থাকা ট্র্যাক লরি গাড়ি ভর্তি করে ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে বিলিয়ে দেয়া যায়। এতে একদিকে কৃষক বাঁচতো অন্যদিকে ক্ষুধার্ত মানুষ পেট ভরে খেতে পার্তো। কি চমৎকার একটা উদ্যোগ হতে পারত পুরো বিষয়টা!
অথচ আমরা দুদিকেই চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছি। গ্রামে মাঠ বোঝাই ফসলের দাম নেই, শহরে খাবার নেই, ধীরে ধীরে দাম বাড়ছে আকাশছোঁয়া। গার্মেন্টস আর রেমিট্যান্স অর্থনিতির প্রধান দুই চালিকা শক্তি বর্তমানে মুখ থুবড়ে পড়েছে, মহাপ্রলয় চলবে আরও কয়েক মাস।  কৃষক আর ক্ষেত আগামী দিনগুলোতে আমাদের বাঁচাতে পারে। আগামী কয়েক মাসে সারা বিশ্বে ব্যাপক আকারে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিবে।
ডলার পাউন্ড খাওয়া যায় না আর কৃষির জায়গায় উন্নত দেশগুলো যেহেতু মহাকাশ গবেষণা স্থাপনা গড়ে তুলেছে (বলদগুলা মঙ্গল গ্রহে ধান চাষ করবে) তাই বিশ্বের বিত্তশালী দেশগুলো হাজার হাজার কোটি ডলার নিয়ে খাদ্যের জন্য কৃষি নির্ভর দেশগুলোতেই হাত পাতবে। করোনা পরবর্তী বিশ্বে খাদ্য পারমাণবিক বোমার চাইতে শক্তিশালী আর ডলারের চাইতে অধিক ক্ষমতাধর সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মাটিতে উর্বর এ দেশের মাটিতে মুখ থেকে বিচি ফেললেও বটবৃক্ষ হয়ে যায়। দেশের মানুষকে পেট ভরে খাওয়ানোর পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে আমরা চাইলে খাদ্য সম্পদকে ব্যবহার করে লিডিং পজিশনে চলে আসতে পারি। দরকার কেবল যোগ্য নেতৃত্ব, স্মার্ট পরিকল্পনা, সঠিক পদক্ষেপ।