মিডিয়া ইসলামের শত্রু নয়

বাংলাদেশ প্রতিদিন তিন হাজার তিনশ’ কোটি টাকার ক্ষতি শিকার করছে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে। এক মাস পার হচ্ছে জরুরি অবস্থার। এর মাঝে এক লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
আগামী আরও এক মাস এমন অবস্থা থাকলে দু লাখ কোটি টাকা হারাতে হবে। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের সবখানে মিলিয়ে এই দুই ট্রিলিয়ন টাকার লস হচ্ছে।
লক ডাউন শেষ হলে দেশের অর্থনীতির কী হবে তা বলা যাচ্ছে না। জিডিপি নেমে দাঁড়াবে অনেক নিচে।
এত সব ক্ষতি শিকার করে সরকার কেন লকডাউনের ব্যাপারে এমন কড়াকড়ি করছে? মিডিয়াগুলোও সব না বুঝে কেন এত বেশি সচেতন করছে? ইতিমধ্যে মাদরাসা বন্ধ করা হয়েছে। মসজিদে মুসল্লি সীমিত করা হয়েছে। এ সব কি মিডিয়ার ইসলাম দুশমনির কারণে?
এমন ধারণা দেয়ারই চেষ্টা করছে বাংলাদেশকে যারা কখনও মনে-প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি তথাকথিত আলেম সমাজের একটি চিহ্নিত মহল। এদেরকে চিনে রাখতে হবে। সামনে বাংলাদেশকে কঠিন সময় অতক্রিম করতে হবে। সে সময় এই কুচক্রী মহল সুযোগ গ্রহণের চেষ্টা করবে।
আমাদের গৌরবের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বিধ্বস্ত দেশে মন্বন্তর দেখা দিয়েছিল। এর সব দায় স্বাধীনতা বিরোধীরা গুজব রটিয়ে চাপিয়েছিল বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর ওপর। সামনে আবারও তারা সেই পুরনো পদ্ধতি অবলম্বন করবে। এখন থেকেই তার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
তথাকথতি কিছু মানুষ সেই পুরোনো রাজনীতি শুরু করেছে। আস্তিক-নাস্তিক বলে সোশ্যাল মিডিয়া গরম করছে। মানুষকে নিয়ে ভাববার মতো ফুরসত তাদের নেই। জীবনের কোনো মূল্য তাদের কাছে নেই।
মানুষ মরল কি বাঁচল তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা ব্যস্ত আছেন নিজেদের শক্তি প্রকাশের নেশায়। যদি সত্যিকার জনসমর্থন থাকত তাহলে এমন শোডাউনের প্রয়োজন হতো না। পায়ের তলায় মাটি নেই বলেই শক্তি জাহির করার চেষ্টা করে এরা।
বাংলাদেশে তিন ধরনের মানুষ আছে। র‌্যাডিকাল, লিবারাল ও মাঝামাঝি। অধিকাংশ মানুষই মাঝামাঝি থাকতে পছন্দ করেন। তারা ঝুট-ঝামেলা পছন্দ করেন না।
উগ্রপন্থী লোকদের মূলত সাধারণ সমাজের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। মানবিকবোধশূন্য এই বকধার্মিকগুলো সাধারণ মানুষ থেকে যতটা সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নেয়া যায় সেই ফিকির করে। কিন্তু সমাজকে কিছু দেয়ার মতো মুরোদ তাদের নেই।
বড় বড় গলায় তারা নিজেদেরকে পুরো বাংলাদেশের নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করার কথা বলেই সুখ পায়। মূলত নির্বাচনে দাঁড়ালে বোঝা যায় এদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে আছে? সর্বোচ্চ দশ ভাগ মানুষকে এরা বিভ্রান্ত করতে পারে। নব্বই ভাগ মানুষ এ সব পছন্দ করে না।
উগ্রবাদীদের জনসমর্থন নেই বলেই জনসমাগম করে নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এরা চরম হীনম্ন্যতার শিকার।
এর আগে ‘ঘরে ঘরে আল্লামা সাইদি দাও’ বলে একজন দেশ ছাড়া হয়েছে। তারপর থেকে এই র‌্যাডিক্যালিস্টরা কোনো পথ পাচ্ছে না। সাইদির মুক্তি চেয়ে এ জন্য জনবিচ্ছিন্ন জামায়াতিরদের আনুকূল্য পাওয়ার নির্বুদ্ধিতা প্রদর্শন করছে কওমি ঘরানার কিছু ভ্রান্ত মানুষ।
এদের সব যোগ্যতা এরা ব্যয় করে বিভক্তির রাজনীতি করতে। মানুষকে আস্তিক-নাস্তিকে ভাগ করাই এদের কাজ।
এর আগে হেফাজতের ব্যানারে এমন সারা দেশ থেকে লোক জড়ো করা হয়েছিল। আল্লামা আহমাদ শফীর নাম ব্যবহার করে তারা নিজেদের ফায়দা হাসিলের পাঁয়তারা করেছিল। শেষতক হীতে বিপরীত হয়েছে। সেই হেফাজত নেতারাই পরর্বতীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে কওমী জননী উপাধতি ভূষতি করেছেন।
এই র‌্যাডিক্যালিস্টদের একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এরা বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে নেয়। মূলধারার সব মিডিয়ার ব্যাপারে এরা অপপ্রচার চালায়। মিডিয়ার সবাই নাস্তিক। সরকারে সবাই মুনাফেক। প্রশাসনের সব দালাল। প্রথম সারির সব দৈনিক হচ্ছে ইসরাইল ও ভারতের টাকায় চলে। দেশের সব বুদ্ধিজীবী আমেরিকার কথায় ওঠে-বসে।
আমরাও কোরআন হাদিস চর্চা করি। জীবন দিয়ে দিয়েছি কিতাবপত্রে। কোথাও তো এমন হীন মানকিতা খুঁজে পেলাম না। এরা আমাদের ইসলাম ধর্মকে ছোট করে। আমাদের দেশের ধর্ম চর্চার পরিবেশ নষ্ট করে। অনেক মানুষকে জানি যারা এদের উৎপাতেই নাস্তিক্যবাদের দিকে ঝুঁকেছে। মানুষকে ধর্মচ্যুত করার পেছনে এ সব ভণ্ডদের একটা বড় ভূমিকা রয়েছে।
মূলত মিডিয়া ও গণমাধ্যমের বিভিন্ন ভুল নিয়ে আলোচনা করার বিরোধিতা আমরা করছি না। কিন্তু এই যে মানসিকতা সবাইকে শত্রু বানিয়ে নেয়া আর আগ বাড়িয়ে ঘোষণা দিয়ে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো এটা কোন্ ধরনের বিবেক-বুদ্ধির কাজ তা আমাদের বুঝে আসে না।
এরা এ দেশকে পাকিস্তানের মতো একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র বানাতে চায়। ধর্মের নামে অধর্ম করে বেড়ানোই এদের লক্ষ্য।
প্রশাসন ও মিডিয়ার হাজারটা দোষ আছে।
কিন্তু এই করোনার মহামারীর সময় কে আমাদের দেশের মানুষকে সচেতন করেছে? মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কারা? এ সব র‌্যাডিক্যাল লোকজন পেরেছে কেবল মসজিদ নিয়ে কূট রাজনীতি করতে। জানাজায় শোডাউন করতে। সত্যিকার মানবদরদ তাদের নেই। সামান্য মানবিকতার পরিচয় তারা দিতে পারেননি।
এখনও বিভক্তির মানসিকতার প্রসার ঘটিয়ে চলেছেন। আল্লাহ তাদের হেদায়াত করুন। এ ধরনের কূচক্রীদের বিরোধিতা করার মতো রুচিও আমাদের হয় না। তবু সাধারণ মানুষের প্রতি কল্যাণ কামনা থেকেই দু-একটি কথা বললাম।
এমন দুর্যোগের সময়ে পরস্পর হানাহানি রাখুন। হাদিসে আছে আসমান থেকে যখন আজাব আসে তখন তিন শ্রেণির মানুষ কোনো জাতির ভেতর থাকলে আল্লাহ গজব উঠিয়ে নেন।
১. যারা রাতের আঁধারে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ২. যারা মসজিদ আবাদসহ বিভিন্ন কল্যাণের কাজ করে। ৩. এবং যারা পারস্পরিক সৌহার্দ ও সম্প্রীতির চেষ্টা করে। পরস্পরকে ভালোবাসে। ঘৃণা না ছড়ায়। [মুসনাদু আহমাদ]
এ সময় মূলত সম্মিলিতভাবে আমাদের মুকাবেলা করতে হবে দুর্যোগ। সে জন্য একে অপরকে ভালোবাসতে হবে। সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট রাখতে হবে। দোহাই লাগে, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখুন।
সরকার মিডিয়া বা প্রশাসনে কাজ করেন বলে তাদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেশের সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করবেন না। তারাও মানুষ। তাদেরও হক আছে আপনার সহানুভূতি ও সৌহার্দ্যের।
প্রেম ক্ষমা ও কাছে টানার শিক্ষা দেয় ইসলাম। মহানুভবতা ও উদারতার সংস্কৃতি চালু করুন। মানুষে মানুষে ভেদাভেদের ঘৃণ্য পথে মানুষকে ঠেলে দিবেন না। মানুষের উপর রহম করুন। আল্লাহ আপনাদের উপর রহম করবেন। আররাহিমুন ইয়ারহামুহুমুর রাহমান।
করোনার বিপদ কেটে গেলে আবারও আপনাদের রাজনীতির সুযোগ হবে। সে পর্যন্ত একটু সুস্থ চিন্তা নিয়ে থাকুন। নিজেরা ঘরে আবদ্ধ থাকুন অন্যদের সচেতন করুন। এবং দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ান। ত্রাণের টাকা উঠিয়ে আত্মসাতের মতো জঘন্য কাজ করবেন না।
আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। ভালো কাজ করার তাওফিক দিন। আমীন।