রোজার প্রকৃত রং ফুটে উঠুক আমাদের জীবনে

মহামান্বিত রমজান সমাগত। এ মাসটিকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বজগতে প্রস্তুতি শুরু হয় বহু আগ থেকে। সবকিছুতে পরিবর্তনের আভাস পেতে থাকে আসমানবাসী। ঊর্ধ্বজগতে সে পরিবর্তনের ছোঁয়া এসে লাগে দুনিয়াতেও।

আল্লাহর ঘর মসজিদ ভরে উঠে মুসল্লি দ্বারা। মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় গরিব-মিসকিন ছাড়াও অসহায় প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনদের প্রতি। রমজানের মহিমায় কঠিন হৃদয়ের ব্যক্তিও বরফের মতো গলতে থাকে। এ সবকিছুই হয় আসমানি পরিবর্তনের প্রভাবে।
আমাদের জীবনে রমজান আসে-যায়। এ পবিত্র মাসটির মূল্য না জানায়, আমরা এর পবিত্রতা রক্ষা করি না। জীবনের ওপর রমজানের পবিত্রতার রং পড়ে না। কিন্তু এবারের রমজান অতিতের যে কোনোটির চেয়ে ভিন্ন। বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সারা দেশ গৃহবন্দী। বাইরে কাজের চাপ তেমন নেই। আবার যে কারো মৃত্যু মুহূর্তেই এসে যেতে পারে। ভাগ্যবান তারা, রমজানে যারা মারা যায়। রাসূল (সা.) সারা জীবন এমন আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে গেছেন। তিনি দোয়া করতেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি রজব ও শাবান মাসে আমাদের হায়াতে বরকত দান করুন এবং রমজান পর্যন্ত আমাদের পৌঁছে দিন।’ তাই এবার যেন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজান হয়। নিজকে রাঙ্গাতে পারি রমজানের পবিত্রতা রং দিয়ে সে চেষ্টা করা।
রমজান আমাদের সামনে সমাগত। ইবাদতের মৌসুম হলো রমজান মাস। রাসূল (সা.) রমজান মাসকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখতেন। একবার রমজানের চাঁদ দেখে তিনি বলেন, ‘মানুষ রমজানের গুরুত্ব বুঝলে সারা বছর এ মাস থাকার আকাঙ্ক্ষা করতো। কিন্তু মানুষের কাছে রমজানের হাকিকত অস্পষ্ট। খুঁজা গোত্রের এক লোক তখন সামনে ছিলো। সে রাসূল (সা.) এর কাছে আবেদন করলো, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাদেরকে রমজানের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু বলুন! রাসূল (সা.) বলেন, ঊর্ধ্বজগতে এক বছর আগে থেকে রমজানের প্রস্তুতি শুরু হয়। রমজানের পরপর, আগামী রমজানের জন্য জান্নাতকে সাজানোর কাজ শুরু হয়ে যায়। সবকিছুর পর যখন রমজান মাস আসে, প্রথম রমজানে মনমুগ্ধকর ঘ্রাণ জান্নাতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। যে ঘ্রাণের সূচনা হয় আল্লাহর আরশ থেকে। 
রমজান আসার সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতের গাছের পাতাগুলো তালি বাজাতে থাকে। অবস্থার এই পরিবর্তন জান্নাতবাসীদের কাছেও অনুভূত হয়। জান্নাতি হুরেরা তখন আল্লাহর কাছে আবেদন করে, হে আল্লাহ! আমাদের জন্য জান্নাতিদের থেকে স্বামী নির্বাচন করে দেন। আমাদের চোখ তাদের দেখে শীতল হবে এবং আমাদের দেখে তাদেরও চোখ জুড়াবে। তখন আল্লাহ তায়ালা অন্যান্য জান্নাতিদের ওপর রোজাদারের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করবেন। দুনিয়ায় যারা রমজানে রোজা রেখেছেন, তাদের সঙ্গে জান্নাতি হুরদের বিয়ের ব্যবস্থা করবেন। (ইমাম বাইহাকি, শুয়াবুল ইমান. মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস নম্বর ১৯৬৭)। হাদিসটির সনদ দুর্বল। তবে এমন অর্থের আরো একটি হাদিস, ইবনে মাসুদ আল গিফারি থেকে বর্ণিত হয়েছে, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনে খুজাইমা স্বীয় সহিহ গ্রন্ত্রে তা নিয়ে এসেছেন। আর দুর্বল হাদিসের সমর্থনে আরো হাদিস থাকলে তা আর দুর্বল থাকে না। (মিরকাতুল মাফাতিহ শরহে মিশকাতুল মাসাবিহ, খণ্ড-৪, পৃষ্ঠা- ৪৫৯) তাছাড়া ফজিলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদিস সমস্যা নয়।
রমজানে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নামিদের তালিকা থেকে বহু মানুষের নাম কেটে দেন। হাদিসে এ প্রসঙ্গে এসেছে, রমজানের প্রথম রজনীতে শয়তান ও অবাধ্য জ্বীনদের বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। এর মধ্যে কোনো একটা দরজাও খোলা থাকে না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেয়া হয়। জান্নাতের কোনো একটা দরজাও বন্ধ রাখা হয় না। আল্লাহর তরফ থেকে, একজন ঘোষক দুনিয়াবাসীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিতে থাকেন, হে কল্যাণের দিকে ধাবমান ব্যক্তি! আরো অগ্রসর হও। হে অসৎ পথে পরিচালিত ব্যক্তি! অন্যায় থেকে বিরত হয়ে আল্লাহর দিকে ফের। আল্লাহ তায়ালা রমজানের প্রতি রাতে বহু লোকের নাম জাহান্নামিদের তালিকা থেকে কেটে দেন। এ ধারা পুরো রমজান অব্যাহত থাকে। (সুনানে তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ)। অন্য একটি সূত্রেও উক্ত হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তবে শেষাংশে কিছু অতিরিক্ত শব্দ যুক্ত হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘যে লোক রমজানের বরকত ও ফজিলত থেকে বিরত থেকে যায়, সে সব রকমের কল্যাণ থেকে বিরত।’ ব্যাখ্যায় এসেছে, তার ক্ষতির পরিমাণ অনুমান করার মতো নয়।
মোল্লাহ আলী কারী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘রমজান এলে মানুষের ইবাদত বন্দেগি বেড়ে যায়, গোনাহগার বান্দারা তওবা করে আল্লাহর বিধি-বিধান পালন করা আরম্ভ করে এবং দুষ্কৃতিকারীরাও অপকর্ম বন্ধ করে ভালো হতে চায়, এগুলো হয়তো আসমানি ঘোষণার কারণেই হয়ে থাকে। ছোট-বড় সবাই রোজা রাখা শুরু করে। এমনকি অধিকাংশ মুসলমান, যারা এতদিন নামাজের কাছেও যেতো না তারাও নামাজ পড়ে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে ঊর্ধ্বজগতে পরিবর্তনের প্রভাব। রোজা হচ্ছে তুলনামূলক কঠিন ইবাদত। সারা দিন পানাহার থেকে বিরত থাকতে হয়। ফলে শরীর দুর্বল হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই ইবাদত-বন্দেগিতে অলসতা আসার কথা। দুর্বলতার দরুণ ঘুমেরও প্রাবল্য থাকে। এততসত্তেও সব মসজিদ ইবাদতের মাধ্যমে আবাদ থাকে। সারা রাত মুসল্লিরা ইবাদত করে।’ (মেরকাতুল মাফাতিহ শরহে মেশকাতুল মাসাবিহ, খণ্ড-৪)। 
হতভাগা ওই সব লোক, যারা রমজানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের বিরাট সংখ্যক লোক রমজানের পবিত্রতার কোনো পরোয়া করে না। অধিক মুনাফার লোভে মানুষের নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। ইসলামে নিষিদ্ধ গুদামজাত করার প্রবণতা এ মাসে আরো বেড়ে যায়। রাসূল (সা.) হাদিসে এসব ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ব্যবসায়ীদেরকে হাশরের ময়দানে গুনাহগারদের কাতারে ওঠানো হবে। তবে যারা ব্যবসায় আল্লাহকে ভয় করেছে, সৎপথে ব্যবসা করেছে এবং সত্য বলেছে তারা ব্যতিত। (সুনানে তিরমিজি-১২১০)।
আল্লাহ তায়ালা বহু লোকের নাম জাহান্নামিদের তালিকা থেকে কেটে দেন, যা আমরা জানতে পেরেছি। আল্লাহ তায়ালার সে গুণের দিকে লক্ষ্য রেখে, রাসূল (সা.)-ও বহু লোককে জেল থেকে মুক্তি দিতেন। রমজান মাসে কেউ কোনো কিছু চাইলে তিনি ফিরিয়ে দিতেন না। ইমাম বাইহাকির সূত্রে এ ব্যাপারে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। সাধারণ অবস্থায়ও রাসূল (সা.) কোনো কিছু দিতে কার্পণ্য করতেন না। আরবের প্রখ্যাত কবি ফারাজদাক রাসূল (সা.) এর বদান্যতা নিয়ে কবিতা লিখেছেন। যার মর্ম হলো, তিনি কালিমায় ‘লা’ বলা ছাড়া আর কোথাও ‘লা’ বলতেন না। ‘লা’ আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো ‘না’। অর্থাৎ তিনি শুধু কালিমায় নাবাচক শব্দ ব্যবহার করেছেন। অন্য কোথাও নাবাচক শব্দ ব্যবহার করেননি। রমজানে, রাসুল (সা.) দান-সদকার ব্যাপারে বিশেষ তৎপর হতেন।
রমজান সমবেদনা ও সহযোগিতার মাস :
রমজান ইবাদত-বন্দেগির মাস। তবে সামাজিক গুরুত্বের দিক থেকেও এ মাস পিছিয়ে নয়। রাসূল (সা.) রমজানের সামাজিক গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেন, ‘রমজান সবরের মাস। আর সবরের প্রতিদান হলো জান্নাত। রমজান সহযোগিতা ও সমবেদনার মাস। রমজান হচ্ছে ওই মাস, আল্লাহর তরফ থেকে যে মাসে বান্দার রিজিক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। কোনো রোজদারকে ইফতারি করালে আল্লাহ তায়ালা গুনাহ মাফ করে দেন। জাহান্নামিদের তালিকায় ওই লোকের নাম অন্তর্ভূক্ত থাকলে তার নাম কেটে দেন। রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব ওই লোকের আমলনামায় লেখা হয়। আর এ কারণে রোজাদারের নেকি থেকে কোনো অংশ কমানো হয় না। রমজানের প্রথম দশদিন রহমত নাজিলের। দ্বিতীয় দশক বান্দাদেরকে ক্ষমার। তৃতীয় দশক হচ্ছে, জাহান্নাম থেকে মুক্তির। যে লোক তার কর্মচারীর কাজ রমজান মাসের জন্য হালকা করে দেবেন, তাকে আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা করে দেন। জাহান্নামিদের তালিকায় তার নাম অন্তর্ভূক্ত থাকলে সেখান থেকে নাম কেটে দেয়া হয়।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান ও সুনানে বাইহাকি)।
প্রথমে বলা হয়েছে রমজান সবরের মাস। অধৈর্য মানুষের শত্রু। পরিবার থেকে নিয়ে সমাজের যেকোনো ক্ষেত্রে কাজের জন্য সবরের প্রয়োজন। ধৈর্যশীল মানুষ সফল হয়। সবরের মূল শিক্ষা আসে রমজান মাসে রোজা থেকে। মানুষের সামনে পানাহারের সমস্ত সামগ্রী উপস্থিত থাকে। থাকে স্ত্রীর সঙ্গে আনন্দ-ফূর্তি করার সুযোগ। কিন্তু এগুলো থেকে সবর করতে হয়। গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে সেহরি খেতে হয়। সেহরি খাওয়ার মুস্তাহাব সময় হচ্ছে শেষ ওয়াক্তে। তাহলে অসময়ে ঘুম থেকে উঠা, খাবারের জন্য শেষ ওয়াক্তের অপেক্ষায় থাকা সবগুলোই ধৈর্যের পরীক্ষা। আধ্যাত্মিকতার জন্যও ধৈর্যের বিকল্প নেই। এক সাহাবি নবী করিম (সা.) এর কাছে এসে আবেদন করেন আমাকে কিছু নসিহত করুন। রাসূল (সা.) বলেন, তুমি রাগ করবে না।
হাদিসে এসেছে রমজান মাস সহযোগিতা ও সমবেদনার জন্য আসে। আমাদের কাছে রমজান এসেছে, যখন চারপাশে মানুষের মাঝে হাহাকার চলছে। অভাবের কারণে বহু মানুষ না খেয়ে আছে। বহু রোগী অর্থের অভাবে চিকিৎসা থেকে বিরত হচ্ছে। তাই এ রমজানে সম্পদশালীদের জন্য সুযোগ এসেছে, গরিবের পাশে দাঁড়িয়ে জান্নাত কামাই করার। আল্লাহ তায়ালা রমজানে রিজিক বৃদ্ধি করে দেন। আমরা প্রতি রমজানে তা প্রত্যক্ষ করি। রিজিক বৃদ্ধি করে দেয়ার কথা বলে, প্রচ্ছন্নভাবে ইশারা করা হয়েছে, বেশি বেশি দান করার প্রতি। দান ও উপঢৌকনের উদাহরণ হিসেবে রোজাদারকে ইফতার করানো কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যে ইফতারি করায়, তাকে রোজাদারের সমপরিমাণ নেকি দেয়া হয়। এ জন্য রোজাদারের নেকি থেকে কোনো অংশ কমানো হয় না। কেউ যদি নিজের সম্পদ গরিবকে দেয়, আশা করা যায় তার সম্পদও কমবে না। হাদিসে কর্মচারীর কাজ হালকা করা কথা বলা হয়েছে। এটাও এক ধরনের সহযোগিতা। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা বান্দার নেকি বাড়িয়ে দেন।
রমজান হচ্ছে, প্রশিক্ষণের মাস। এ মাসে প্রশিক্ষণ নিয়ে সারা বছর রমজানের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হয়। সবর, সহযোগিতা, সমবেদনা ও উদারতার শিক্ষায় ভরে উঠুক আমাদের জীবন তথা রোজার প্রকৃত রং ফুটে উঠুক আমাদের জীবনে। আল্লাহ তায়ালার কাছে এ দোয়াই আমরা করবো। ইনশাআল্লাহ! আমিন।