আমলাদের ‘পাছায় লাথি’ ফর্মুলায় দুঃস্থ তালিকা

ড. আকবর আলী খান। মন্ত্রীপরিষদ সচিব দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। আমলার চেয়েও বড় পরিচয় তিনি একজন পন্ডিত, বুদ্ধিজীবী, লেখক। তার লেখা ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ গ্রন্থের একটি প্রবন্ধের শিরোনাম হলো ‘বিকেন্দ্রীকরণ ক্ষমতার দ্বৈত হস্তান্তর’। এই প্রবন্ধে আমলাদের দিয়ে ত্রানের দায়িত্ব দিলে কি ভয়াবহ বিপত্তি হতে পারে তার একটি উদাহরণ দিয়েছেন। সম্প্রতি করোনা মোকাবেলায় আমলারাই সর্বেসর্বা হয়েছেন। এরফলে কি ধরণের পরিস্থিতি হতে পারে, তা আচ করা যায় এই প্রবন্ধ থেকে। পাঠকদের জন্য ঐ প্রবন্ধের চুম্বক অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো-
গত শতকের ষাটের দশকের প্রথম দিকে গল্পটি লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজম খানের নামে প্রচলিত ছিল। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। চট্টগ্রামে ঘুর্নিঝড়ের পর তিনি উপদ্রুত অঞ্চল সফরে যান। সেখানে তাঁকে খবর দেওয়া হয় যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের তালিকা সাত দিনের মধ্যে প্রণয়ন না করলে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হবে না। এই বার্তা পেয়ে আজম খান সঙ্গে সঙ্গে চিফ সেক্রেটারিকে ফোন করেন এবং বলেন, ÔMr. Chief Secretary, I want the distressed person’s list in 6 days time (তিনি হাতে এক দিন সময় রাখেন) and if you can not deliver on time I will give you a kick in the back সামরিক কর্মকর্তার গালি খেয়ে চিফ সেক্রেটারি কমিশনারকে ফোন করলেন এবং বললেন, ‘Mr. Commissioner I want this damn list in 5 days’ time and if you can not deliver on time I will give you two kicks on your back,Õ কমিশনার এই ফোন পেয়ে ডেপুটি কমিশনারকে ফোন করলেন এবং বললেন, চার দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য তাঁকে দিতে হবে, অন্যথায় ডেপুটি কশিনারের পাছায় তিনি তিনটি লাখি মারবেন। ডেপুটি কমিশনার সঙ্গে সঙ্গে মহকুমা প্রশাসককে ফোন করলেন এবং বললেন যে যেসব তথ্য চাওয়া হয়েছে, তা তিন দিনের মধ্যে দিতে হবে আর না দিতে পারলে তাঁর পাছায় চারটি লাখি দেওয়া হবে। মহকুমা প্রশাসক সার্কেল অফিসারদের ফোন করলেন এবং বললেন, দুই দিনের মধ্যে সব তথ্য তাঁর কাছে পৌছাতে হবে আর যদি সার্কেল অফিসার এ কাজ যথাসময়ে করতে না পারেন, তবে তাঁর পাছায় পাঁচটি লাথি দেওয়া হবে। সার্কেল অফিসার সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানকে জানালেন, দুদিনের মধ্যে তাঁকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে, অন্যথায় তাঁর পাছায় পড়বে ছয়টি লাথি। লাথির হুমকিতে ক্ষিপ্ত হয়ে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান চৌকিদারকে ডেকে তাঁর পাছায় একটি লাথি মারেন এবং বলেন, এক দিনের মধ্যে সব তথ্য সংগ্রহ করে তাঁকে দিতে হবে, অন্যথায় তাঁর কপালে আরও লাথি জুটবে। মনের দুঃখে চৌকিদার অফিস থেকে বের হয়ে সামনে যে ব্যক্তিকে পেলেন, তাঁকে প্রথমে চড় মারলেন ও তারপর তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলেন। নামটি সঙ্গে সঙ্গে কাগজে টুকে নিলেন। তারপর ভাবলেন যে সরকার ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তির নাম চেয়েছে। শ’ দুয়েক নাম হলেই তাঁর কাজ হয়ে যাবে। তিনি লোকটিকে বললেন যে তাঁকে আরও ১৯৯টি নাম বলতে হবে, অন্যথায় তাঁকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। ইতিমধ্যে চৌকিদারের কাণ্ড দেখে রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে গেছে। সবার সহযোগিতায় এক ঘন্টার মধ্যে দুই’শ নামের তালিকা তৈরি হয়ে গেল। চৌকিদার সঙ্গে সঙ্গে তা চেয়ারম্যানের কাছে দাখিল করলেন। চেয়ারম্যান সঙ্গে সঙ্গে তা ওপরের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। এমনি করে সারা বিভাগের তথ্য যথাসময়ে সংকলিত হয়ে গভর্নরের কাছে যথাসময়ে পৌঁছায়। গভর্নর মহাখুশি যে বেঁধে দেওয়া সময়ের অনেক আগেই তাঁর প্রশাসন কাজটি সম্পন্ন করেছে। প্রশাসন সাফল্য দাবি করলেও আসলে কাজটি ব্যর্থ হয়। যে তালিকা প্রণয়ন করা হয়, সে তালিকা ভুয়া এবং যখন রিলিফ আসে, তখন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান ও চৌকিদার ভুয়া লোকদের জন্য প্রেরিত ত্রান অতি সহজে আত্মসাৎ করেন। ওপরের দিকে কর্তারা এই ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করতে পারেন যে তাঁদের প্রশাসনব্যবস্থা কার্যকর এবং ঠিক সময়ে কাজটি করেছে। কিন্তু আসলে দেখা গেল যে ওপরের কর্মকর্তারা যতই হম্বিতম্বি করুন না কেন, লাথি খেয়েছেন চৌকিদার আর চড় খেয়েছেন সাধারণ মানুষ। দুর্গত ব্যক্তিদের তালিকা প্রস্তুত করা যায়নি আর ভুয়া তালিকায় রিলিফের মাল হয়ে গেছে চুরি। এ ধরনের কেন্দ্রীভূত প্রশাসনে জনগণের কোনো অংশ নেই এবং কার্যকর প্রশাসনের দৌলতে অতি দ্রুত তালিকা তৈরি হলেও জনগণের কোনো লাভ হয়নি।’