কর্মহীন আওয়ামী লীগের ‘ক্রাইসিস’ ম্যানেজাররা

যে কোন রাজনৈতিক দলে কিছু ক্রাইসিস ম্যানেজার থাকেন, যারা সংকটকালীন সময়ে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন। সংকট উত্তরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই সমস্ত নেতারা দলের মূল নেতাদের সুপরামর্শ দেন। দলের মূল নেতার নির্দেশনা বাস্তবায়ণের ক্ষেত্রে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। নিজস্ব উদ্ভাবনী এবং সৃষ্টিশীলতা দিয়ে সংকট উত্তরণের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে। শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই রাজনীতিতে এমন ক্রাইসিস ম্যানেজাররা আলোচিত। 
বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর‌্যালোচনা করলে দেখা যায় যায়, যখন কোন রাজনৈতিক দল সংকটে পড়ে তখন ক্রাইসিস ম্যানেজারদেরকে ডাকা হয় এবং তারা সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে দলের মূল নেতাকে সহায়তা করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার চতুর্থবার ক্ষমতায় রয়েছে। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সালে ২১ বছর পর প্রথম ক্ষমতায় এসেছির দলটি। তারপর ২০০৯ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় আছে দরটি। আর এই সময় আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার কিছু ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ছিল যারা সংকটকালীন সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদেরকে বলা হয় আওয়ামী লীগের ক্রাইসিস ম্যানেজার। এই সমস্ত নেতারা এখন করোনা সংকটের কালে প্রায় কর্মহীন। আওয়ামী লীগের অনেক তৃণমূলের কর্মীরা মনে করেন, এই ক্রাইসিস মুহুর্তে যদি তাদের কাজে লাগানো যেত তাহলে হয়তো শেখ হাসিনা যেভাবে করোনা সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে চাইছেন সেই সংকটের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হতো এবং সংকট থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে তারা ভালো সহায়তা করতে পারতেন। আসুন আমরা দেখে নি আওয়া্মী লীগের ক্রাইসিস ম্যানেজার কারা?
বেগম মতিয়া চৌধুরী
১৯৯৬ সালে কৃষিমন্ত্রী ছিলেন বেগম মতিয়া চৌধুরী। ২০০৯-১৮ সাল পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।টানা তিন মেয়াদে কৃষিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি কৃষিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। শুধু আওয়ামী লীগ নয়, প্রত্যেকটা মানুষ মনে করে বাংলাদেশ যে কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে , বাংলাদেশে যে কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটা সুষ্ঠুতা এসেছে, কৃষি উৎপাদন যে বেড়েছে তার একটি বড় কারণ হলেন মতিয়া চৌধুরী। নীরবে নিভৃতে সততার সঙ্গে তিনি কাজটি  পালন করেছেন। আর এই কারণেই বাংলাদেশে যে কৃষির উত্তরণ তার সঙ্গে বেগম মতিয়া চৌধুরীর নাম অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। বিশেষ করে ২০০৯ সালে যখন শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় আসে তখন দেশে চরম খাদ্য সংকট ছিল। কৃষি উৎপাদনের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। এরকম একটি বাস্তবতায় শেখ হাসিনা কৃষিমন্ত্রী হিসেবেই দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বাংলাদেশে কৃষিতে যে অব্যবস্থাপনা ছিল সেটা দূর করেন। আধুনিক কৃষির মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। 
তোফায়েল আহমেদ
বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে তোফায়েল আহমেদ দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম মেয়াদে দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দায়িত্ব পালন অবস্থায় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিসহ বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় নিজেকে ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন রকমের দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, সিন্ডিকেটসহ বাণিজ্য ক্ষেত্রে যে দুষ্টু ক্ষতগুলো তা দূর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কাউকে বিরাগভাজন করে নয়, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা মোকাবিলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন আওয়ামী লীগের এই নেতা। 
আমির হোসেন আমু
১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় দফায় দেড় বছরের জন্য খাদ্য মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার আমলেই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছিল। খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সারা দেশের হিসেব রাখা এবং চাহিদা নিরুপণ করে সেভাবে খাদ্য বলয় তৈরীর দায়িত্ব তিনিই প্রথম পালন করেছিলেন। আর সেভাবেই আমির হোসেন আমু দলের ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। যদিও রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় তিনি বহু আগে থেকেই ক্রাইসিস ম্যানেজার হিসেবে পরিচিত। 
তালুকদার আব্দুল খালেক
১৯৯৮ সালে যে বন্যা হয়েছিল সে সময় সকলে মনে করেছিল, দেশে বোধ হয় তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিবে। খাদ্য ঘাটতি হবে এবং মানুষ অনাহারে মারা যাবে। কিন্তু সেই সময় শেখ হাসিনার বিশ্বস্ত সিপাহসালা হিসেবে ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী তালুকদার আব্দুল খালেক এক বিরল নজির স্থাপন করে সারাদেশে প্রশংসিত হয়েছিলেন। সেই সময় ত্রাণের নূণ্যতম গাফিলতি বা অভিযোগ উঠেনি। সুষ্ঠু ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় আওয়ামী লীগ সরকার একটি নতুন মাইল ফলক স্থাপন করেছিল। সেই সময় তালুকদার আব্দুল খালেক সৎ শেখ হাসিনার সিপাহসালা হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন। 
এরকম আরো কয়েকজন ক্রাইসিস ম্যানেজার আছে আওয়ামী লীগে। আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীরাই মনে করেন, এখন সংকটকালীন সময় শেখ হাসিনার পাশে দরকার এইসব ক্রাইসিস ম্যানেজারদের। যারা এই সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।