করোনা মহামারীর শঙ্কা কেটে যাচ্ছে বাংলাদেশে?

গত এক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণের শঙ্কা তিনশো থেকে চারশোর মধ্যে ঘোরাঘুরি করছে। যে সমস্ত দেশে করোনা মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল সেসব দেশের চেয়ে বাংলাদেশে এই চিত্রটা অবশ্যই ব্যতিক্রম। কারণ যখনই তিনশো চারশোর ঘরে কোনো দেশে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছিল তার দুই তিন দিনের মাথায় এটি এক হাজার অতিক্রম করেছিল। ১ এপ্রিল যেখানে বাংলাদেশে তিনজন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে ৬ তারিখে এসে শনাক্ত হয় ৩৫ জন। আর ৯ এপ্রিল শনাক্ত হয় ১১২ জন। ১৪ এপ্রিল সেটা ২০০ জনে পৌঁছায়। তখনই আশঙ্কা করা হয়েছিল যে, বাংলাদেশে বোধহয় জ্যামিতিক হারে করোনা সংক্রমণ বাড়বে এবং ক্রমশঃ বাংলাদেশ হয়তো মহামারীর কালো গহ্বরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। কিন্তু গত এক সপ্তাহের পরিসংখ্যান যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব যে, ১৭ এপ্রিল করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২৬৬ জন, ১৮ এপ্রিল ৩০৬ জন, ১৯ এপ্রিল ৩১২ জন। এরপর ২০ এপ্রিল ৪৯২ জন, যা এ যাবতকালে দেশে এক দিনে সর্বাধিক করোনা শনাক্তের ঘটনা। তারপর ২১ এপ্রিল শনাক্তের সংখ্যা ছিল ৪৩৪ জন। ২২ এপ্রিল ৩৯০ জন। আর আজ ৪১৪ জন। অর্থাৎ একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যেই করোনার সংক্রমণ সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে, দেশে করোনার সীমিত সংক্রমণ হয়েছে এবং সীমিত সংক্রমণের মধ্যে এটা গন্ডিবদ্ধ আছে।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ এটিকে ইতিবাচক এবং ভালো খবর মনে করছেন। তিনি বাংলা ইনসাইডারের সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন যে, সংক্রমণ যদি এই হারে এ মাসটা চলতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে এ যাত্রা হয়তো আমরা বেঁচে গেলাম, এবং বাংলাদেশে করোনা বিস্তৃত হচ্ছে না।
করোনা বা যে কোনো রোগকে আমরা মহামারী তখন বলতে পারি যখন এর বৃদ্ধি উল্লম্ফন হয় এবং যখন জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশে প্রথম ৮ মার্চ করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ২৩ মার্চ ৬ জন করোনা রোগী পাওয়া গিয়েছিল। আর এক মাসেরও বেশি সময় পর এসে ৪ হাজার ১৮৬ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ করোনা সংক্রমণে যে জ্যামিতিক বৃদ্ধি হওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশে সেটা ঘটছে না।
এটিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, বাংলাদেশে সামাজিক সংক্রমণ হয়েছে সত্যি কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু ক্লাস্টারের মধ্যেই তা গণ্ডিবদ্ধ রয়েছে। সেটা খুব বেশি ছড়ায়নি। সাধারণ ছুটিসহ ঘরে থাকার কিছুটা সুফল দেশের মানুষ পেয়েছে। তবে এর ভিন্নমতও রয়েছে।
ভিন্নমত পোষনকারীরা বলছেন যে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পরীক্ষার হার খুবই কম। ৩৬ হাজার ৯০টি পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র। তাছাড়া সারা দেশে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে সব এলাকায় পরীক্ষা এখনও সীমিত আকারে হচ্ছে এবং ব্যাপকভাবে যে পরীক্ষা করা দরকার সেটা হচ্ছে না। পরীক্ষা ছাড়া উপসর্গহীন মানুষ বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘস্থায়ী করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও তারা মনে করছেন।
তারা মনে করেন যে, বাংলাদেশে যে এলাকাগুলোতে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে সেই এলাকাগুলোতে ব্যাপক ভিত্তিতে পরীক্ষা করা দরকার। এই পরীক্ষা না হলে আমরা আসলে বাংলাদেশের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবো না।
একজন বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন যে, বাংলাদেশে ৩৬ হাজার ৯০টি পরীক্ষা করা হয়েছে গত ৪৫ দিনে। অথচ এই সময়ের মধ্যে ইতালিতে পরীক্ষা করা হয়েছিল ১৫ লাখের উপর। স্পেনে পরীক্ষা করা হয়েছিল ২০ লাখের কাছাকাছি। আর যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষা করা হয়েছিল ৩০ লাখ মানুষের। এই পরীক্ষা কম হওয়ার কারণেই বাংলাদেশ ইতালি, স্পেন বা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে করোনা সংক্রমণের দিক থেকে অনেক ভালো অবস্থানে আছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
আজ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. জাহিদ মালেক প্রথম ৪৫ দিনের হিসেব দিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ ইতালি, স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ভালো আছে। তিনি বলেন যে, ৪৫ দিনে ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখের উপর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশে সেখানে মাত্র ৪ হাজার ১৮৬ জন।
কিন্তু কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ আনুপাতিক হার দেখিয়ে বলেছেন যে, প্রথম ৪৫ দিনে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণের হার ১০ ভাগের উপর। সেই হার যদি আমরা ইতালি, স্পেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে দেখা যাবে যে, বাংলাদেশেও ওই দেশগুলোর মতোই একই রকম হারে সংক্রমণ বেড়েছে।
যদি আমরা দ্রুত পরীক্ষা করে প্রকৃত অবস্থা বুঝতে না পারি তাহলে এটি যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে তখন তা রোধ করা কঠিন হয়ে যাবে।
বিশেষজ্ঞরা এটাও বলছেন যে, এখন কলকারখানাগুলো খুলে দেওয়া হচ্ছে। পরীক্ষাবিহীন এই কলকারখানা খুলে দেওয়া এবং সামাজিক দূরত্বের বিধি নিষেধ তুলে দেওয়ার ফলে বাংলাদেশে একটি বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে। কাজেই আমরা প্রকাশ্য মহামারী যদি এড়াইও, করোনায় নীরব মহামারী সংক্রমণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।